মুসলিম স্থ‍াপত্যের এক অনবদ্য নিদর্শন লাল বাগের কেল্লা

মুসলিম স্থ‍াপত্যের এক অনবদ্য নিদর্শন লাল বাগের কেল্লা


0 1909

বাংলা গ্যাজেট ডেস্ক: মুসলিমরা আজ বিশ্বের সবচেয়ে পরাজিত ও অসহায় জাতী হিসেবে পরিলক্ষিত হলেও মুসলিমদের রয়েছে প্রায় সাড়ে তেরশত বছরের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। যখন বিশ্বের বুকে একমাত্র পরাশক্তি ছিল মুসলিমরা। সারা বিশ্বে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাসের পাতাকে উজ্জল করে রেখেছে মুসলিমরা। সেই ন্যায় বিচার ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও এখনো পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে মুসলিমদের বিভিন্ন ঐতিহ্য। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার (পুরান ঢাকার) লালবাগের কেল্লা তেমনই এক স্থাপনা যা এখনো স্মরণ করিয়ে দেয় মুসলিমদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে।

ইতিহাস:

মোঘল আমলে বাংলায় নির্মিত ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে ঢাকার বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত লালবাগ কেল্লাটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পুরাকীর্তি। সতেরো শতকে বাংলায় মোগল শাসকদের শাসন মনোভাব, স্থাপত্য বিকাশের ঐতিহাসিক ক্ষেত্র এই লালবাগ কেল্লা।

ইতিহাসের পাতায় লালবাগ কেল্লার রূপকার হিসেবে শায়েস্তা খানের নাম পাওয়া গেলেও শায়েস্তা খান মূলত এই স্থাপনা নির্মাণকার্য শুরু করেননি। এটির নির্মাণের স্বপ্ন এবং সূচনা ঘটেছিল মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মুহাম্মদ আযম শাহের হাত ধরে। আযম শাহ ১৬৭৮-৭৯ সাল পর্যন্ত মাত্র এক বছর বাংলার সুবাদার ছিলেন।

LalbaghFortPartialViewনির্মাণ প্রথমে এই কেল্লার নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। এই কেল্লার নকশা করেন শাহ আজম। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব-এর ৩য় পুত্র আজম শাহ ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার সুবেদারের বাসস্থান হিসেবে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী স্থানে এ দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মাত্র এক বছর পরেই দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ হবার আগেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট আওরঙগজেব তাকে দিল্লি ডেকে পাঠান। এসময় একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মাণের পর দুর্গ নির্মাণের কাজ থেমে যায়। নবাব শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে ঢাকায় এসে পুনরায় দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তবে শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর এ দুর্গ অপয়া মনে করা হয় এবং শায়েস্তা খান ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ বন্ধ করে দেন। এই পরী বিবির সাথে শাহজাদা আজম শাহের বিয়ে ঠিক হয়েছিল।

দুর্গ নির্মাণে শায়েস্তা খানের নিদারুণ অনাগ্রহ পর্যবেক্ষিত হলেও আপন কন্যা ইরান দুখতের মাজারকে তিনি দর্শনীয় স্থাপনা বানিয়ে তোলেন। মাজারটি নির্মাণের লক্ষ্যে শায়েস্তা খান ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাদা মার্বেল, ব্যাসল্ট, বেলে পাথরসহ আরও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ উপকরণ এনেছিলেন। আর এগুলোর সমন্বয়করণেই তৈরি হয়েছিল লালবাগ কেল্লার অন্যতম দর্শনীয় পরী বিবি বা ইরান দুখতের মাজারটি। পরী বিবির মৃত্যুর পর তাকে লালবাগ দুর্গের মাঝেই সমাহিত করা হয়, আর এরপর থেকে একে পরী বিবির সমাধি নামে আখ্যায়িত করা হয়। পরী বিবির সমাধির যে গম্বুজটি আছে তা একসময় স্বর্ণখোচিত ছিল, কিন্তু এখন আর তেমনটি নেই, তামার পাত দিয়ে পুরো গম্বুজটিকে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এই একটি মাত্র ইমারতে মার্বেল পাথর, কষ্টি পাথর ও বিভিন্ন রং এর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। কক্ষগুলির ছাদ কষ্টি পাথরে তৈরি। মূল সমাধি সৌধের কেন্দ্রীয় কক্ষের উপরের কৃত্রিম গম্বুজটি তামার পাত দিয়ে আচ্ছাদিত। ২০.২ মিটার বর্গাকৃতির এই সমাধিটি ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দের পুর্বে নির্মিত। তবে এখানে পরীবিবির মরদেহ বর্তমানে নেই বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

আরো যা রয়েছে:

এই মাজার ছাড়াও লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে রয়েছে গোসলখানা, একটি মসজিদ, পুকুর আর বাগান।

index কেল্লাতে একটি মসজিদ আছে, আজম শাহ দিল্লি চলে যাওয়ার আগেই তিনি এই মসজিদটি তৈরি করে গিয়েছিলেন। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি যে কারো দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম। মসজিদটিতে জামায়াতে নামায আদায় করা হয়। ঢাকায় এতো পুরনো মসজিদ খুব কমই আছে।

লালবাগ কেল্লাতে এখানে ওখানে বেশ কয়েকটি ফোয়ারার দেখা মিলবে, যা শুধুমাত্র কোনো বিশেষ দিনে চালু থাকে (যেমনঃ ঈদ)। কেল্লাতে সুরঙ্গ পথ ও আছে, লোক মুখে শোনা যায় যে আগে নাকি সুরঙ্গ পথগুলোতে যাওয়া যেতো, তবে এখন আর যাওয়া যায়না। উল্লেখ্য সুরঙ্গ পথ এ যাওয়ার কথাটি নিতান্তই শোনা কথা, এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

লালবাগ কেল্লায় সর্বসাধারণের দেখার জন্যে একটি জাদুঘর রয়েছে, যা পূর্বে নবাব শায়েস্তা খাঁ এর বাসভবন ছিল আর এখান থেকেই তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। জাদুঘরটিতে দেখার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। মুঘল আমলের বিভিন্ন হাতে আঁকা ছবির দেখা মিলবে সেখানে, যেগুলো দেখলে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। শায়েস্তা খাঁ এর ব্যবহার্য নানান জিনিসপত্র সেখানে সযত্নে রয়েছে। তাছাড়া তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, সেসময়কার প্রচলিত মুদ্রা ইত্যাদিও রয়েছে।

DSC00753পুরো বাংলার শাসনক্ষমতা মোগল সম্রাটের অধীনস্থ থাকলেও সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানের মেয়ের স্মৃতিস্বরূপ লালবাগ কেল্লাটিকে শায়েস্তাখানকে দান করে দেন। শায়েস্তাখানের পরবর্তী বংশধরেরা কেল্লাটিকে সরকারের কাছে লিজ দিয়ে বার্ষিক ৬০ টাকা করে পেতেন। পুরানা পল্টন থেকে ১৮৫৩ সালে সেনানিবাস পরিবর্তন করে এই লালবাগ কেল্লায় নিয়ে আসা হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের ক্ষেত্রেও এই কেল্লাটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে কেল্লাটিকে একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এখতিয়ারে আছে।

নতুন সংযোজন:

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লায় স্থায়ী আলো ও শব্দ সংযোজন করা হয় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ফলে ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’ তে আলো-শব্দে দর্শক দেখতে পাবে ৪০০ বছরের রাজধানী ঢাকা আর বাংলাদেশের ইতিহাস।

‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’ তে লালবাগ কেল্লার দৃশ্য
‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’ তে লালবাগ কেল্লার দৃশ্য

প্রতিদিন সাপ্তাহিক ছুটি রোববার ছাড়া সন্ধ্যার পর দুটি করে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। শুধু আবহাওয়া খারাপ থাকলে এবং বর্ষাকালে প্রদর্শনী বন্ধ থাকবে। টিকিটের মূল্য ২০ টাকা।

এ ছাড়া সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত (রোববার পুরোদিন ও সোমবার অর্ধদিবস ব্যতীত) দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে লালাবাগ কেল্লার গেইট। তবে টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। ৫ বছর বয়সের কম বয়সী বাচ্চাদের কোন টিকিট লাগে না।

NO COMMENTS

Leave a Reply