মায়ের মর্যাদা: পুঁজিবাদ বনাম ইসলাম

মায়ের মর্যাদা: পুঁজিবাদ বনাম ইসলাম


0 547

বাংলা গ্যাজেট ডেস্ক: বিশ্ব এখন ইসলাম দিয়ে নয়, পুঁজিবাদ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূলমন্ত্রই হলো ‘মুনাফা’। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় সব কিছুকে মুনাফার মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়। এমনকি মায়ের মর্যাদাও। একজন, মা, পৃথিবীতে একজন মানুষের প্রতি যার অবদান, দয়া ও সহানুভূতি সবচেয়ে বেশি, সেই ‘মা’ কেও অর্থের মাপকাঠিতে মাপা হয়। এই ব্যবস্থায় সেই মায়ের কোন মূল্য নেই যে ‘মা’ শুধুই ‘মা’। সেই মায়ের অনেক মর্যাদা যে ‘মা’ শুধু ‘মা’ নয় বরং সেই সাথে অনেক অর্থের মালিক। তাইতো চাকুরিজীবী একজন ‘মা’ কে যে চোখে দেখা হয়, একজন গৃহিণী মাতাকে সেই চোখে দেখা হয় না। আমাদের মিডিয়ায়, পাঠ্যপুস্তকেও ইদানিং এ বিষয়গুলোর বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। মায়ের কাজগুলোকে খুব খাটো করে দেখানো হচ্ছে। আর বাবার কাজগুলোকে খুব মর্যাদা সম্পন্ন বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ‘মা’ রান্না করে, বাচ্চা লালন-পালন করে , ঘরের নানান কাজ করে , স্বামীর দেখা-শুনা করে প্রভৃতি। এসব কাজ করার মাধ্যমে ‘মা’ যেহেতু আপাতদৃষ্টিতে কোন অর্থ উপার্যন করে না তাই মায়ের এসব ত্যাগ-তিতিক্ষাময় কাজগুলোর কোন মূল্যায়ন করছে না এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। অন্যদিকে ‘বাবা’ যেহেতু বাইরে চাকুরি বা ব্যবসা করে অর্থ উপার্যন করছে তাই বাবার কাজগুলোকে তুলে ধরা হচ্ছে মর্যাদা সম্পন্ন হিসেবে। আবার যে সকল মায়েরা চাকুরি বা ব্যবসা করছে তাদেরকে তুলে ধরা হচ্ছে খুব স্মার্ট হিসেবে।

অনেক ত্যাগ ও দুঃখ-দুর্দশা সহ্য করে একজন মা বড় করে তোলেন তার সন্তানকে। প্রায় ১০ মাস উদরে ধারণ করে তার রক্ষণাবেক্ষণ, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরও দুই বছর পর্যন্ত দুধপান করানোর কঠিন দায়িত্ব পালন এবং এর পর আদর-যত্ন করে লেখাপড়া ও আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়ে আস্তে আস্তে মানুষে রূপান্তর করার কঠিন চ্যালেঞ্জ মাকেই গ্রহণ করতে হয়। এসব যৌক্তিক কারণেই মায়ের মর্যাদা ও অধিকার অনেক বেশি। হোক সেই ‘মা’ গৃহিণী বা চাকুরিজীবী। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো আমাদের সমাজে একজন নারী ‘দেহ বিক্রি’ করে টাকা উপার্জন করার মত নিকৃষ্ট কাজ করেও তার কাজের স্বীকৃতি পায়। রাষ্ট্র থেকে আইন করা হয়েছে যে, ‘দেহ বিক্রি’ করাকে ছোট চোখে দেখা যাবে না। কারণ এটিও একটি পেশা! ‘দেহ ব্রিক্রির’ মত নোংরা একটি কাজকেও ‘পেশা’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। শুধু এই জন্য যে এই কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জিত হয়। আর একজন গৃহিনী আপাতদৃষ্টিতে কোন অর্থ উপার্জন করে না বলে তার কাজের কোন স্বীকৃতি নেই। মায়ের কাজের প্রতি শুধু অবহেলা ভরা দৃষ্টিভঙ্গিই সমাজ থেকে প্রদান করা হয়।

আমরা যদি মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি দেখি তাহলে দেখবো, ইসলাম একজন ‘মা’কে এত বেশি সম্মানিত করেছে যা আর কোন ব্যবস্থা করেনি। ‘মা’ য়ের প্রতিটি কাজকে ইসলাম অনেক বেশি সম্মান দিয়েছে। একজন ‘মা’ প্রশংসিত তার সন্তানকে দুগ্ধ পান করানোর জন্য, লালন-পালনের জন্য, ঘরের প্রতিটি কাজ করার জন্য। একজন পুরুষকে জিহাদের ময়দানে গিয়ে যে সম্মান অর্জন করতে হয় সেই সম্মান একজন ‘মা’ সংসারের কাজগুলো করেই পেয়ে যাচ্ছেন। সন্তান লালান-পালনের কাজকে ইসলাম ‘জিহাদের’ সম মর্যাদা দান করেছে।

একজন ‘মা’ অর্থ উপার্জন করুক বা নাই করুক তার মর্যাদা অপরিসীম। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের তলে সন্তানের বেহেশত।’ (ইবনে মাজা, নাসায়ী)। এ হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্টত বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে সন্তান জান্নাতে ঠাঁই পাবে কিনা তা মায়ের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি মুমিনকে যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানে সচেষ্ট থাকতে হবে তেমনি জননীর প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ ঘটাতে হবে। রসুল (সা.) জেহাদে যাওয়ার চেয়েও মায়ের সেবা করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

বোখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিসে বর্ণিত, এক লোক রসুল (স.)-এর দরবারে এসে বলল : হে আল্লাহর রসুল! কোন ব্যক্তি আমার সদাচরণ ও আনুগত্য পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকারী? তিনি এরশাদ করলেন, তোমার ‘মা’। সে আরজ করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার ‘মা’। আবার সে আরজ করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার ‘মা’। পুনরায় সে নিবেদন করল, তারপর কে? তিনি জবাব দিলেন, “তোমার পিতা।”         সন্তানের জন্য তুলনামূলকভাবে মা-ই বেশি ত্যাগ স্বীকার করেন। গর্ভধারণ, দুধপান, রাত জেগে সন্তানের তত্ত্বাবধানসহ নানাবিধ কষ্ট একমাত্র মা-ই সহ্য করেন। তা ছাড়া সন্তানের প্রতি মা-ই সবচেয়ে বেশি যত্নবান এবং বেশি আদর-সোহাগ করে থাকেন।

ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে মহিমান্বিত করেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে; সুতরাং আমার শুকরিয়া ও তোমার মা-বাবার শুকরিয়া আদায় করো- (সুরা লুকমান : ১৪)।

আমরা আমাদের পিতামাতার প্রতি যতই দয়ালু ও কৃতজ্ঞ হই না কেন, আমরা তাদের প্রয়োজন ও অধিকার অনুসারে সবকিছু প্রদান করতে সমর্থ নই। এজন্যে কোরান মাজিদ আমাদেরকে বলে, পিতামাতার জন্যে আমাদের দোয়াও করতে হবে। যাতে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দয়া করেন এবং সেসব বিষয় তাদের জন্য সরবরাহ করেন যা তাদেরকে আমরা দিতে অক্ষম। তাইতো আল্লাহ আমাদের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, “আর তাদের উভয়ের উপর দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, হে আমাদের রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমার প্রতি লালন পালন করেছেন।”(বনি ইসরাইল, ১৭:২৪)

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর কাছে আগমন করল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি পাপ করেছি। আমার ক্ষমা পাওয়ার কোন পথ আছে কি? তিনি জানতে চাইলেন, তাঁর মাতা জীবিত আছেন কিনা? যখন লোকটি বলল, না’। তিনি জানতে চাইলেন, তার মাতার ভগ্নি জীবিত আছেন কিনা? যখন লোকটি বলল, হাঁ। তিনি বললেন, তাকে ভালভাবে সেবা যত্ন কর। (তিরমিযি)

এই হাদিসটি আমাদেরকে দুটি বুনিয়াদি বিষয় শিক্ষা দেয়। প্রথমত: যদি কোন ব্যক্তি কোন পাপ কাজ করে বসে এবং এর দ্বারা আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে, সে তার মায়ের সেবা করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ফিরে পেতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি তার মাতা মৃত্যুবরণ করে তবে সে তার মায়ের ভগ্নির সেবার মাধ্যমেও আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ফিরে পেতে পারে।

পরিশেষেঃ ইসলাম ‘মা’ অথবা ‘বাবার’ কারো সম্মানই অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন করে না। মা-বাবা যদি অমুসলিমও হয় তবুও তাদের পরিপূর্ণ দেখভালের কথা বলা হয়েছে। শুধু পারিবারিক বা আধ্যাতিক জীবনেই নয়, ইসলাম সর্বক্ষেত্রে মায়ের মর্যাদাকে নিশ্চিত করেছে। যখন পৃথিবীতে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত ছিল তখন পারিবারিক, সমাজিক ও রাষ্টীয়ভাবে একজন মায়ের মর্যাদাকে নিশ্চিত করা হতো। কোন মা’কে তখন বুঁঝা মনে করার সুযোগ ছিল না। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ এর মত বিষয় যা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফসল তা তখন মানুষ কল্পনাও করতে পারতো না। ‘মা’ কে খুশি করে জান্নাত হাসিল করাই ছিল সন্তানদের প্রচেষ্টা। আর কোন কুলাঙ্গার সন্তান যদি ‘মা’ য়ের ( এবং বাবার) দ্বায়িত্ব নিতে না চাইতো তবে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হত এবং মায়ের দায়িত্ব নিতে তাকে বাধ্য করা হত। তবে তেমন ঘটনা চোখে পড়তো না বললেই চলে।