প্রতিবেশীর হক অনাদায়কারী প্রকৃত মুমিন নয়

প্রতিবেশীর হক অনাদায়কারী প্রকৃত মুমিন নয়


0 1470

পুঁজিবাদী আদর্শ যেখানে একজন ব্যক্তিকে কেবল তার নিজের স্বার্থ নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে, ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ এমন কন্সেপ সরবরাহ করে সেখানে ইসলামী আদর্শ একজন মুসলমানকে দীক্ষা দেয় ‘সকলের তরে সকলে আমরা ,প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এমন শিক্ষায়। তাইতো ইসলাম কখনো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করে না, বরং নিজের বাইরেও আশেপাশের অন্যান্য মানুষের কল্যাণ সাধন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই জীবনের পাথেয় হিসেবে তুলে ধরে।

আজকের সমাজের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই ব্যক্তি তার নিজেকে, তার পরিবারকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে তার প্রতিবেশীর দিকে নজর দেওয়ার কোন খেয়াল তার হয় না। শহরগুলোতে তো একই বিল্ডিংয়ের এক ফ্লাটের মানুষ জানে না পাশের ফ্লাটের মানুষের খবর। অথচ ইসলাম প্রতিবেশীর খোজ খবর নেয়াকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ(সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ইমান রাখে তার কর্তব্য হল সে যেন নিজ প্রতিবেশীর সাথে সদাচারণ করে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৮৫)

প্রতিবেশীর হকএকবার সাহাবায়ে কেরাম(রা) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ(সা) প্রতিবেশীর হক কি? নবীজী(সা) বললেন, “যদি সে তোমার কাছে কিছু চাই তাহলে তাকে সাহায্য কর, যদি সে নিজের প্রয়োজনে ধার চাই তাকে ধার দাও, যদি সে তোমাকে দাওয়াত করে তা কবুল কর, সে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দেখতে যাও, যদি তার ইন্তাকাল হয়ে যায় তাহলে তার জানাযায় শামিল হও, যদি সে কোন মুসিবতে পড়ে তাকে শান্তনা দাও,নিজের পাতিলে গোস্ত রান্নার খুশবু দিয়ে তাকে কষ্ট দিয় না (কেননা হতে পারে অভাবের কারণে সে গোস্ত রান্না করতে পারে না)বরং কিছু মাংস তার ঘরে পৌছে দাও, আপন বাড়ীর ইমারত তার বাড়ীর ইমারত হতে এতটা উচু কর না যাতে তার ঘরে বাতাস বন্ধ হইয়ে যায় অবশ্য তার অনুমতিক্রমে হলে ভিন্ন কথা” (তারগিব)।

প্রতিবেশীর প্রয়োজনে সামর্থ্ অনুযায়ী তাকে সাহায্য করাটাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালন করলে তার প্রয়োজন পূরণে আল্লাহ জিম্মাদার হয়ে যান।হাদীস শরীফে এসেছে, “যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পুরা করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পুরা করেন।” (সহীহ বুখারী,হাদীস ২৪৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮০)

প্রতিবেশির সাথে খারাপ ব্যবহার করাকে ইসলাম অত্যন্ত গর্হিত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।একবার একব্যক্তি রাসুল(সা) কে বললেন, “হে আল্লাহর নবী(সা) অমুক মহিলা অধিক পরিমানে নামায, রোজা ও দান-খয়রাত করে কিন্তু আপন প্রতিবেশীদেরকে নিজের জবানের দ্বারা কষ্ট দেয় অর্থাৎ গালিগালাজ করে।” রাসুল(সা) বললেন, “সে দোজখে যাবে।” আতঃপর সে ব্যক্তি আরজ করলেন, “হে আল্লাহর নবী(সা)! অমুক মহিলা নফল নামায, নফল রোজা ও দান-খয়রাত কম করে, বরং তার দান-খয়রাত পনীরের একটি টুকরোর থেকে বেশি নয়, কিন্তু নিজের প্রতিবন্ধীদেরকে জবানের দ্বারা কষ্ট দেয় না।” রাসুল(সা) বললেন, সে জান্নাতে যাবে” (মুসনাদে আহমাদ)।

একজন মুসলমান যদি নামায রোজা করে অথচ তার প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার না করে বা প্রতিবেশীর খেয়াল রাখে না রাখে তাহলে সে ভালো মুসলমান হতে পারবে না। এই ব্যাপারটা এই হাদিসটি থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাসুল(সা) বলেছেন, ‘ঐ ব্যক্তি (পুর্ণ) মুমিন হতে পারবে না যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে” (তাবারানী, আবু ইয়ালা, মাজমায়ে যাওয়ায়েদ)।

রাসুল(সা) আরও বলেছেন, ‘তোমরা যখন তরকারি পাকাও তখন তাতে জল দাও এবং ঝোল বাড়াও এবং কিছু অংশ তোমার প্রতিবেশীর কাছে পৌছে দাও’ (তিরমিযী)।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) হতে বর্ণিত একবার একব্যক্তি রাসুল(সা)কে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ(সা)! আমি কিভাবে জানতে পারব এই কাজটি ভালো করেছি বা এই কাজটি খারাপ করেছি?” রাসুল(সা) বললেন, “যখন তোমার প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে তোমার কাজকর্ম ভালো তখন নিশ্চয় তোমার কাজকর্ম ভালো। আর যখন তোমার প্রতিবেশী বলবে তোমার কাজকর্ম খারাপ তখন নিশ্চয় তোমার কাজকর্ম খারাপ” (তাবারানী, মাযমায়ে যাওয়ায়েদ)।

আল্লাহ তা’আলা সুরা নিসার মধ্যে বলেছেন, “তোমরা সকলেই আল্লাহ তা’আলার সাথে কোন জিনিসকে শরিক করিও না এবং মা বাবার সাথে ভালো ব্যবহার কর এবং আত্মীয় স্বজনদের সাথেও এবং এতিমদের সাথেও মিসকিনদের সাথেও এবং নিকটবর্তী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীদের সাথেও এবং নিকটে যারা বসে তাদের সাথেও (অর্থাৎ যারা দৈনিক আসা যাওয়া ও সঙ্গে উঠা বসা করে) এবং মুসাফিরের সাথেও এবং ঐ গোলাম (দাস) দের সাথেও যারা তোমাদের অধীনে আছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ এমন লোকদের পছন্দ করেন না যারা নিজেদেরকে বড় মনে করে ও অহংকার করে”।

মূলত প্রতিবেশী মানবসমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ফলে ইসলামে প্রতিবেশীর হককে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি তাগিদ করেছেন যে, আমার কাছে মনে হয়েছে প্রতিবেশীকে মিরাছের অংশীদার বানিয়ে দেয়া হবে। (দ্র.সহীহ বুখারী ৬০১৪;সহীহ মুসলিম ২৫২৪)

তাই এই বিষয়ে আমাদের অবহেলা না করে বরং একে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া দরকার। তা না হলে এই অবহেলার দায় একজন মুসলিম হিসেবে আমরা এড়াতে সক্ষম হবো না।

 

NO COMMENTS

Leave a Reply