পহেলা বৈশাখ: অসাম্প্রদায়িকতার আড়ালে হিন্দু সংস্কৃতি !

পহেলা বৈশাখ: অসাম্প্রদায়িকতার আড়ালে হিন্দু সংস্কৃতি !


0 1191

আজ পহেলা বৈশাখ। প্রতিবছরের মতো এবারেও লাল-সাদা শাড়ি পড়ে, নেচে-গেয়ে, বাদ্য বাজিয়ে, মুখে উল্কি এঁকে, মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে যাবতীয় অমঙ্গলকে দূর করার প্রয়াসে সর্বোপরি পান্তা-ইলিশ খেয়ে এদেশের নব্বই ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত জনগোষ্ঠী পহেলা বৈশাখ পালন করেছে। রমনা বটমূল সহ দেশের নানা প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ঢাকার পথে পথে বসেছে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা।

এ দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল আর সংস্কৃতিমনা মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারা সবাই প্রচার করছেন যে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক এবং সার্বজনীন অনুষ্ঠান। বলা হচ্ছে এটি বাঙালির চিরাচরিত ঐতিহ্য, হাজার বছরের সংস্কৃতি। হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সবাই যাতে বিনা সংকোচে এই উৎসব পালন করে সেজন্য সব ধরণের প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং তা সফলও হয়েছে। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখকে দেশের ৯০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষেরা অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান ভাবতে শুরু করেছে। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে ‘মঙ্গলশোভাযাত্রা’ তেমনটিই প্রমাণ করে।

কিন্তু সুশীল সমাজের দাবী অনুযায়ী পহেলা বৈশাখের উৎসব কি আসলেই অসাম্প্রদায়িক? আসলেই কি এটি বাঙালীর হাজার বছরের সংস্কৃতি? আমরা যদি পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা সন চালু করার ইতিহাস দেখি তাহলে দেখব ভারতবর্ষে মুঘল শাসনামলে সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে খাজনা আদায় করতো। কিন্তু, হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষির ফলনের সাথে মিলত না। এজন্য সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সৌর ক্যালেন্ডারের উপর ভিত্তি করে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল “ফসলি সন”। এভাবেই, বাংলাসন গণণা আরম্ভ হয়। তবে, বর্তমানে যে রকম ঢাকঢোল পিটিয়ে, বাদ্যবাজনা বাজিয়ে বা শোভাযাত্রা করে বৈশাখের প্রথম দিনকে আমন্ত্রন জানানো হয়, পেছনে ফিরে তাকালে আমরা এসব কোনকিছুই দেখতে পাবো না।

বস্তুত: আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। যে বছর প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ আর পূজার ব্যবস্থা করা হয়। আর, পহেলা বৈশাখকে সমস্ত বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব বা হিন্দু-মুসলিমের সার্বজনীন উৎসব বলে চালানোর ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও, এ উৎসব কখনই এ অঞ্চলে সার্বজনীন কোন উৎসব ছিল না। বস্তুত: আমাদের দেশে মাত্র কয়েক দশক যাবত ঘটা করে নববর্ষ উৎযাপন করা হচ্ছে। অতীতে পহেলা বৈশাখে প্রধান কাজ ছিল সারা বছরের দেনা-পাওনার হিসাব নিকাশ, খাজনা আদায়, শুল্ক পরিশোধ করা ইত্যাদি। এদিনে হিন্দু জমিদাররা নিজ নিজ প্রজাদের মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ণ করতো এবং এ অনুষ্ঠানকে বলা হতো “পূণ্যাহ”। খাজনা আদায়ের পুরনো হিসাব-নিকাশের পাট চুকিয়ে বৈশাখের প্রথম দিন থেকে নতুন খাতা খোলা হত, যাকে বলা হত “হালখাতা”। পুরনো ঢাকার হিন্দু স্বর্ণকারদের মধ্যে হালখাতা অনুষ্ঠানের বেশী প্রচলন ছিল।

এ ছাড়া, পহেলা বৈশাখের আগের দিন অর্থাৎ, চৈত্রের শেষ দিনে, বাঙ্গালী হিন্দুরা চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব পালন করতো। এটি তাদের একটি ধর্মীয় উৎসব। হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে, এ দিনে স্নান, ব্রত, উপাসনা প্রভৃতি ক্রিয়াকর্ম পূণ্য জনক। (বাংলা পিডিয়া)

চৈত্রসংক্রান্তির দিন বাংলায় শিব কেন্দ্রিক একটি বিশেষ উৎসব পালিত হয়। এটি “চড়ক পূজা” নামে পরিচিত। চড়ক পূজা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকোৎসব। চৈত্রের শেষ দিন এ পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং বৈশাখের প্রথম দু-তিন দিনব্যাপী চড়ক পূজার উৎসব চলে।

অন্যদিকে পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রত্যুষে নতুন সূর্যকে যেভাবে সুরের মূর্ছনায় বরণ করে নেয়া হয়, সেটাও হাজার বছরে পূর্বের সূর্য পূজারী বা প্রকৃতি পূজারী সম্প্রদায়ের অন্ধ অনুকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।কেননা বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন সূর্যের কাছে প্রকৃতি পূজারীদের মতোই নিজেদের অমঙ্গল থেকে রক্ষার জন্য সূর্যের নিকট প্রার্থনা করা হয়।

সুতরাং, এটা সুস্পষ্ট যে, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা সূর্যবন্দনা এ প্রতিটি অনুষ্ঠানিকতা পুরোপুরি মূর্তি পূজারী হিন্দুদের বিশ্বাসের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তাহলে কি করে এই সকল অনুষ্ঠান অসাম্প্রদায়িক হয়? হিন্দুদের সংস্কৃতি কিভাবে বাঙালী সংস্কৃতি হয়? যেখানে এদেশের হিন্দুদের সংখ্যা শতকরা ৮-৯ ভাগ। সংখ্যালঘু হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ৯০ ভাগ মুসলমানের উপর চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী?

আমাদের সমাজ থেকে যদিও সর্বদা প্রচার করা হচ্ছে “ধর্ম যার যার, ‍উৎসব সবার”। অর্থাৎ, আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যে সম্প্রদায়ের অংশ হই না কেন, উৎসব পালন কালে আমরা সবাই এক। এই মতাদর্শ আর সব ধর্মের মানুষ গ্রহণ করতে পারলেও একজন মুসলমান কি তা পারে? পারে না। কারণ ইসলাম আট-দশটা ধর্মের মত শুধুই ধর্ম নয়, বরং ইসলাম হল একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা।

পুঁজিবাদী সমাজের ধর্মণিরপেক্ষতাবাদে (সেক্যুলারিজম) বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী যদিও সবসময় বলে থাকে যে, ইসলাম থাকবে শুধু মসজিদে।আমাদের ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, শাসনব্যবস্থা কিংবা অর্থনীতি কোন কিছুতেই ধর্মের কোন স্থান নেই। কিন্তু, ইসলামের মূলনীতি বা বিশ্বাসের সাথে এ বিশ্বাস বা শ্লোগান পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কেননা আল্লাহতায়ালা সুরা মায়িদাহ’তে ঘোষণা করেছেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম আর ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা (দ্বীন) হিসাবে মনোনীত করলাম।”

সুতরাং, মুসলিমরা অন্য ধর্মের অনুসারীদের মতো “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”এমন কোন আকিদায় বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না। যে আকিদাহ একজন মুসলমানকে মুশরিকদের মত আচরণ করতে শিখায়। ইসলামী জীবনব্যবস্থার রয়েছে সম্পূর্ণ নিজস্ব আচার-আচরণ ও সংস্কৃতি। মুসলিমদের জন্য ভিন্ন কোন সম্প্রদায় যেমন ইহুদী, নাসারা, মুশরিক কিংবা অগ্নি পূজারীদের সংস্কৃতি বা আচার-আচরণ অনুকরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুল (সা) বলেছেন, “কেউ যদি কোন সম্প্রদায়কে অনুকরণ করে, তবে তাকে (শেষবিচারের দিনে) তাদের একজন বলে গণ্য করা হবে।”সুতরাং, মুসলিমের ঘরে জন্মগ্রহণ করেও আমরা যদি মূর্তি পূজারীদের সংস্কৃতিকে অনুকরণ করি তবে, শেষ বিচারের দিনে আমাদের তাদের একজন হিসাবে গণ্য করা হবে।

এ ছাড়া, হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে,“যখন আল্লাহ’র রাসুল মদীনায় আসলেন, তখন মদীনার অধিবাসীদের দুটো উৎসবের দিন ছিল, যে দিনগুলোতে তারা আনন্দ-উৎসব করতো। তিনি (সা) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, “এ দিনগুলো কিসের জন্য?” তারা বললো: “জাহেলিয়াতের যুগে আমরা এ দিনগুলোতে আনন্দ-উৎসব করতাম।” আল্লাহর রাসুল (সা) বললেন, “আল্লাহতায়ালা তাদের এ দুটো দিনের চাইতে উত্তম দুটো দিন তোমাদের দান করেছেন। আর তা হল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা’র দিন।” (আবু দাউদ, হাদিস নং, ১১৩৪) এ ছাড়া, অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা) বলেছেন, “…প্রতিটি সম্প্রদায়েরই নিজস্ব উৎসব রয়েছে এবং এটি (ঈদের দিন) হল আমাদের উৎসব।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং, ৯৫২)

সুতরাং, মূর্তিপূজারীদের বিশ্বাস থেকে উত্থিত পহেলা বৈশাখকে সার্বজনীন ঘোষণা দিয়ে কোন মুসলমান তা পালন করতে পারে না।কারণ এটি ইসলামী জীবনব্যবস্থা অনুমোদিত কোন উৎসব নয়।

আরো একটি প্রচারণ চালানো হয় যে, নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি। অথচ এধরনের কোন বিশ্বাস বা ধ্যান-ধারণা ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে গেল। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন:

“নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [আল-মায়িদাহ, ৫:৭২]

সবশেষে: বলাই বাহুল্য এদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল কিছু বুদ্ধিজীবী আর সংস্কৃতিমনা কিছু ব্যক্তিত্ব দেশীয় ঐতিহ্য, বাঙ্গালীর হাজার বছরের সংস্কৃতি কিংবা কৃষ্টি কালচারের নামে পহেলা বৈশাখকে যতই অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মণিরপেক্ষ প্রমাণ করার চেষ্টা করুক না কেন বাস্তবতা হল এ উৎসব সম্পূর্ণরূপে সাম্প্রদায়িক এবং হিন্দু ধর্মভিত্তিক একটি উৎসব। তাই এদেশের মুসলমানদের উচিত এসব আচার অনুষ্ঠান হতে বিরত থাকা।

NO COMMENTS

Leave a Reply