তারাবীহ নামাজ নিয়ে বিতর্ক কতখানি যৌক্তিক?

তারাবীহ নামাজ নিয়ে বিতর্ক কতখানি যৌক্তিক?


0 610

রমজান আসলেই যে বিষয়টি নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয় তা হল তারাবীহ এর সালাত কয় রাকাত-২০ রাকাত, নাকি আট রাকাত। কেউ যুক্তি দিয়ে বলে তারাবীহ নামাজ ২০ রাকাত আর যারা ৮ রাকাত পড়ছেন তাদের ভুল হচ্ছে, তাদের নামাজ হচ্ছে না। আবার কেউ বলছে ৮ রাকাতই পড়তে হবে ২০ রাকাত নয়। তারাবীহ নামাজ নিয়ে তারা একে অপরের দলিল-প্রমাণকে দুর্বল বলে সাব্যস্ত করছে। এ নিয়ে মুসল্লিদের বিতর্ক শুধু বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বরং তা ঝগড়ায়ও রূপান্তরিত হয়। একে অপরকে দোষারূপ করে এবং অপরের মতকে বিদআত বলেও আখ্যা প্রদাণ করে থাকেন! প্রশ্ন হল এই বিতর্কের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর কী কোন উপকার হচ্ছে? কোন উপকারতো হচ্ছেই না, বরং এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই না থেকে ক্ষেত্র বিশেষে হয়ে যাচ্ছে পরস্পর পরস্পরের শত্রু।(নাউযুবিল্লাহ্)

বিতর্কে জড়ানোর আগে মুসলিম ভাই ও বোনদের মনে রাখা উচিত তারাবীহর শরিয়তী বিধান কি? অর্থাৎ এটা ফরজ নাকি নফল? আমরা সবাই জানি এটি ফরয নয়। অথচ ইসলামে মুসলমানদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার ব্যাপারে যে নির্দেশ রয়েছে, সেটি নফল নয় বরং ফরজ। নফল বা সুন্নত হল সেই কাজ, যদি কখনো কোন কারণে তা পরিত্যাগ করা হয় তাহলে মানুষ গুনাহগার হবে না। আর ফরজ হল ঐ কাজ, যা পরিত্যাগ করলে বা নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ গুনাহগার হয় এবং পরকালে এর জন্য শাস্তি ভোগ করতে হয়।

মহান আল্লাহ ও তাঁর সর্বশেষ রাসূল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়ে বার বার মুসলমানদের তাগিদ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর রজ্জু শক্ত করে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”(সূরা আল-ইমরান : ১০৩)

মুসলিম উম্মাহর একতা সম্পর্কে কোরআন মজিদে আরো ইরশাদ করা হয়েছে, “তোমাদের এ উম্মাহ নিঃসন্দেহে এক অভিন্ন উম্মাহ। আর আমিই তোমাদের রব; অতএব তোমরা আমারই দাসত্ব-আনুগত্য কর। আর তারা (অনৈক্যের নায়করা) তাদের বিষয়কে (দ্বীনকে) পারস্পরিকভাবে টুকরো টুকরো ও বিভক্ত করে নিয়েছে। কিন্তু (তাদের এ মারাত্মক কাজ করার আগে মনে রাখা উচিত ছিল যে,) প্রত্যেককেই আমাদের কাছে ফিরে আসতে হবে।” (আল-আম্বিয়া : ৯২-৯৩)।

কাজেই মুসলিম উম্মাহর উচিত নয় কোন বিষয় নিয়ে এমন কিছু করা যাতে করে তাদের মধ্যে একতায় ফাটল ধরে বা তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট হয়ে যায়।

তারাবীহ নামাজ কয় রাতাক হবে তা নিয়ে আমরা যারা বিতর্ক করি তাদের জানা প্রয়োজন যে আমরা হল অধিকাংশই আম মুসলিম। যারা শরীয়াহ বিধান সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। পবিত্র কোরআনের আয়াত বা রাসুল (সা.) এর বর্ণিত হাদিস থেকে কিভাবে কোন ইবাদত বা অন্য বোন বিষয় থেকে হুকুম বের করতে হয় তা আমরা জানি না। কোরান ও হাদিস থেকে সঠিক ইজতিহাদের মাধ্যমে হুকম শরঈ কে অনুধাবন করা হয়। আর এই ইজতিহাদের কাজটি করেন একজন মুজতাহিদ(কোরান-হাদিস থেকে ইজতিহাদ করে হুকুম শরীয়াহ বের করার যোগ্যতা সম্পন্ন লোককে মুজতাহিদ বলে)। একজন মুসলিম, একজন মুজতাহিদের ইজতিহাদের মাধ্যমে হুকম শরঈ সম্পর্কে অবগত হয়। সকল মুজতাহিদের ব্যপারে আল্লাহ’র হুকম হচ্ছে, মুজতাহিদ ইজতিহাদের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এবং যা তার নিকট সর্বাধিক সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় সেটিই তার জন্য হুকুম। এরূপ প্রশিদ্ধ কিছু মুজতাহিদ হলেন ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেকী, ইমাম হাম্বলী ও ইমাস আবু হানিফা।

এখন আপনার যে ইমামের বিশ্লেষণের প্রতি সন্তুষ্টি ও আস্থা সৃষ্টি হবে আপনি সেটাই কার্যকর করবেন এবং অন্যদেরকে কোরআন ও সুন্নাহর দলিল দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু অন্যকেও তার নিজস্ব পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী চলতে দিতে হবে। কেননা, প্রত্যেক মুসলমানই নিজের বিশ্লেষণের স্বপক্ষে কোরআন হাদীস থেকেই দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে ভিন্নতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। দ্বীনের মৌলিক বিষয় ও সর্বসম্মত বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যাবেন। লক্ষ করুন, এসকল আলেমগণ কিন্তু নিজে হুকুম বানাচ্ছে না। তারা শুধু কোরান ও হাদিসের আলোকে আল্লাহ প্রদত্ত হুকুমটি সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। যেমন: আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরয করেছেন। এই ফরয বিষয় নিয়ে তাদের কিন্তু কোন কথা চলবে না। কারণ এটি সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত। তবে নামাজ আদায়ের সময় পা কতটুকু ফাঁকা রাখবো, হাত কোথায় বাঁধবো অথবা নামাজের আগে নিয়ত পড়তে হবে কিনা প্রভৃতি বিষয়ে তারা কোরান-হাদিসের আলোকে একটি দিক নির্দেশনা দিতে পারবেন।

একইভাবে তারাবীহ নামাজ কয় রাকাত পড়তে হবে তা নিযে এরূপ মুজতাহিদগণ মাসআলা বা নির্দেশনা দিতে পারেন। কেউ ২০ রাকাতের পক্ষে আবার কেউ ৮ রাকাতের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। মাসলা মাসায়েলের শাখা প্রশাখায় আপনি যেটাকে উত্তম মনে করবেন সেটাই আমল করবেন। আর অন্যের সিদ্ধান্তকে কখনোই অশ্রদ্ধা করা যাবে না বা এ নিয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়া যাবে না। কেননা এটি যেমন শরীয়াহ সম্মত নয়, তেমনি এর ফলে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়। যার ফলে মুসলিমরা কোনভাবেই লাভবান হয় না বরং লাভবান হয় ইসলামের শত্রুরা। নিশ্চয়ই আমরা ইসলামের শত্রুদের লাভ হয় এমন পথকে সুগম করবো না।

NO COMMENTS

Leave a Reply