চলো না ঘুরে আসি অজানাতে…

চলো না ঘুরে আসি অজানাতে…


0 2269

বাংলা গ্যাজেট ডেস্ক: ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন না এমন মানুষের সংখ্যা খুব কমই আছে। পৃথিবীর অপার রূপ দেখে বিমোহিত হতে কে না ভালবাসে। যদিও ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবী ছেড়ে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে স্রষ্টার সান্নিধ্যে। আর সেখানেই মানুষের আসল গন্তব্য, তবুও এই মায়াময় পৃথিবীর চারিপাশে ভ্রমণ করতে সবারই ভাল লাগে। আজ ভ্রমণ বিভাগে আলোচনা করা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত একটি দ্বীপ ‘সেন্টমার্টিন’ নিয়ে। সৃষ্টিকর্তার অপার নিয়ামতে ভরপুর এই দ্বীপটি যখন আপনি ভ্রমণ করবেন তখন আপনার মন সৃষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠবে।

জাজিরাসেন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মায়ানমারের উপকূল হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে একে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হয়ে থাকে।

অসংখ্য প্রবাল রাশি মিলে মিশে একাকার হয়ে তৈরী করেছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন। সাগরের সুনীল জলরাশি আর নারিকেল গাছের সারি এই দ্বীপকে দিয়েছে অপার সৌন্দর্য। বালুকাময় সৈকত, প্রবালের প্রাচীর আর কেয়া গাছের সারি এই দ্বীপকে দিয়েছে আলাদা এক বৈশিষ্ট যা আর কোথাও নেই। উত্তাল সাগরের নোনা জল যখন আছড়ে পরে কেয়া গাছের ফাঁকে, ঝিরি ঝিরি বাতাসে তৈরী হয় সফেদ ফেনা, সে এক মাতাল করা দৃশ্য। রাতের জোৎস্না এসে যখন লুটোপুটি খায় চিকচিকে বালুর বুকে, নীল আকাশ তখন আরও নীলাভ হয়। নিরব রাতে চারিদিকে শুধু সাগরের হুংকার আর ঢেউ এর আছড়ে পড়ার গর্জন। অপূর্ব, অসাধারণ, অদ্ভুত সুন্দর। হাজারো জোৎস্না রাতের চেয়েও সুন্দর সেন্ট মার্টিনের একটি নির্ঘুম চাঁদনী রাত, এখানে কাটানো সময় এগিয়ে চলে কিন্তু সৌন্দর্য পিপাসার তৃষ্ণা মেটে না।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপকবে প্রথম এই দ্বীপটিকে মানুষ শনাক্ত করেছিল তা জানা যায় না। প্রথম কিছু আরব বণিক এই দ্বীপটির নামকরণ করেছিল জিঞ্জিরা। উল্লেখ্য এরা চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাতায়াতের সময় এই দ্বীপটিতে বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করতো। কালক্রমে চট্টগ্রাম এবং তৎসংলগ্ন মানুষ এই দ্বীপটিকে জিঞ্জিরা নামেই চিনত।১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কিছু বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এই দ্বীপের বসতি স্থাপনের জন্য আসে। এরা ছিল মূলত মৎস্যজীবী। যতটুকু জানা যায়, প্রথম অধিবাসী হিসাবে বসতি স্থাপন করেছিল ১৩টি পরিবার। এরা বেছে নিয়েছিল এই দ্বীপের উত্তরাংশ। কালক্রমে এই দ্বীপটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। আগে থেকেই এই দ্বীপে কেয়া এবং ঝাউগাছ ছিল। সম্ভবত বাঙালি জেলেরা জলকষ্ট এবং ক্লান্তি দূরীকরণের অবলম্বন হিসাবে প্রচুর পরিমাণ নারকেল গাছ এই দ্বীপে রোপণ করেছিল। কালক্রমে পুরো দ্বীপটি এক সময় ‘নারকেল গাছ প্রধান’ দ্বীপে পরিণত হয়। পুরো দ্বীপ ঘুরলে মনে হবে নারিকেল বাগান এটি। আপনি চাইলে অর্থের বিনিময়ে তৃষ্ণা মেটাতে পারেন নারিকেল জলে। এখানে হাজার তিনেক স্থানীয় লোকজন বসবাস করে। সিংহভাগই মুসলমান। খুবই ধার্মিক ও সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ এরা। তাই কোন প্রকার চুরি ছিনতাই এর সম্ভাবনা নেই এখানে। গভীর রাত পর্যন্ত আপনি জোসনা স্নান করতে পারেন নির্বিঘ্নে।

সেন্ট মার্টিন.এটি সত্যিই একটি ভিন্ন প্রকৃতির দ্বীপ। এর একদিকে যেমন প্রবাল প্রাচীর ঘিরে রেখেছে, অন্যে দিকে বালুকাময় সৈকত প্রহর গুনছে আপনার অপেক্ষায়। সমুদ্রজলে অনায়াসেই আপনি করে নিতে পারেন স্নান কাজটি। এই সৈকতের লাল কাকড়া আর নুরি পাথর আপনাকে নিঃসন্দেহে আকৃষ্টে করবে। অবচেতন মনেই আপনি কুড়িয়ে নিবেন বিভিন্ন রং এর আর ঢং এর নুরি পাথর সাথে ঝিনুক খন্ড।

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১শ ৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১শ ৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১শ ৫৭ প্রজাতির গুপ্ত জীবী উদ্ভিদ,২শ ৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ১শ ২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে পেজালা নামে পরিচিত সী উইডস বা অ্যালগি (Algae) এক ধরণের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্ট মার্টিন্সে প্রচুর পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে তবে লাল অ্যালগি (Red Algae) বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ ছাড়াও রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া, সন্যাসী শিল কাঁকড়া,লবস্টার ইত্যাদি। মাছের মধ্যে রয়েছে পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল করাল,রাঙ্গা কই, সুঁই মাছ, লাল মাছ,উড়ুক্কু মাছ ইত্যাদি। সামুদ্রিক কচ্ছপের (গ্রিন টার্টল ও অলিভ টার্টল প্রজাতি) ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে জায়গাটি খ্যাত।

সেন্ট মার্টিনসেন্ট মার্টিনে যাওয়ার জন্য টেকনাফ হতে নৌকা বা বোটে চরতে হবে। যাত্রাপথটিও দেখার মত। যাত্রাপথে গাংচিল আর ডলফিন দেখতে দেখতে এই ২ ঘন্টার ভ্রমণটি আপনি মুহূর্তেই কেটে যাবে। আর দুর সাগরের নীলাভ অথৈ পানির মাঝে যখন সবুজে ঢাকা দ্বীপটি আপনার দৃষ্টিগোচর হবে সারা রাতের দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি দুর হয়ে যাবে নিমিষেই।

দ্বীপে পা দিয়েই বুঝতে পারবেন কেন একে বলা হয় সুন্দরের লীলাভূমি। বাংলাদেশে যতগুলো দৃষ্টিনন্দন পর্যটন এলাকা রয়েছে সেন্ট মার্টন তার মধ্যে অন্যতম ও নান্দনিক। দ্বীপটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থে কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। সেন্ট মার্টিন্সের পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার প্রবাল প্রাচীর। দ্বীপের শেষ মাথায় সরু লেজের মত আর একটি অবিচ্ছিন্ন দ্বীপ রয়েছে যার নাম ছেঁড়াদ্বীপ। জোয়ারের সময় পানি এসে এটিকে মূল দ্বীপ হতে বিচ্ছিন্ন করে বলেই এর নামকরণ করা হয়েছে ছেঁড়াদ্বীপ। ভাটার সময় পানি নেমে গেলে এটি আবার মূল দ্বীপের সাতে সংযুক্ত হয়ে যায়। তখন পায়ে হেঁটেই চলে যাওয়া যায় সেখানে। এখানে কোন লোক বসতি নেই। এই অংশটি একেবারেই প্রবাল ময়। এখানে স্বচ্ছ জলের নীচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারো ধরনের প্রবাল। নানান রংয়ের মাছেরা খেলা করে প্রবালের ফাঁকে। সত্যিই সে এক দেখার মত দৃশ্য।

hqdefaultএখানে থাকার জন্য বেশ কয়েকটি হোটেল মোটেল ও কটেজ রয়েছে। ব্লুমেরিন, অবকাশ পর্যটন সহ বেশ কয়েকটি উন্নতমানের হোটেল রয়েছে। কটেজগুলোও চমৎকার। কটেজের বারান্দায় বসে চা খেতে খেতেই উপভোগ করতে পারবেন সাগরের মায়াবী রূপ। এখানে বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা নেই। জেনারেটর ও সৌর বিদ্যুতই একমাত্র ভরসা। এখানে একটি মাত্র বাজার রয়েছে জাহাজ ঘাটে। রয়েছে অনেকগুলো খাবার হোটেল। এখানকার তাজা রুপচাঁদা মাছের ফ্রাই খেতে অসাধারণ। আপনি চাইলে জেলেদের কাছ থেকে তাজা মাছ কিনে এনে হোটেলে ভেজে নিতে পারেন। আর একটি বিখ্যাত জিনিস এখানে পাবেন, সেটা হলো শুঁটকী। নানান প্রজাতি মাছের হরেক রকম শুঁটকী এখানে পাওয়া যায়। খুব সহজে ও সুলভ মূল্যে এখান হতে শুঁটকী সংগ্রহ করতে পারেন।

এখানে দুই ধরনের পর্যটক বেড়াতে আসে। কেউ কেউ সেন্ট মার্টিন এসে ঐ দিনই ফিরে যায়। আবার কেউ কেউ রাত্রি যাপন করে। যারা দিনে এসে দিনেই ফিরে যায় তাদের দেখার সুযোগ খুব কম। কিন্তু যারা রাত্রিযাপন করেন তাদের জন্য রয়েছে সৌন্দর্যে উপভোগের অপার সুযোগ।

সেন্ট মার্টিনে গেলে পার্শ্ববর্তী যেসকল দৃশ্যাবলী উপভোগ করতে পারবেন:

ছেঁড়াদ্বীপ

সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিন পাশের শেষ মাথায় সরু লেজের মত আর একটি অবিচ্ছিন্ন দ্বীপ রয়েছে যার নাম ছেঁড়াদ্বীপ। জোয়ারের সময় পানি এসে এটিকে মূল দ্বীপ হতে বিচ্ছিন্ন করে বলেই একে ছেঁড়াদ্বীপ বলা হয়। ভাটার সময় পানি নেমে গেলে এটি আবার মূল দ্বীপের সাতে সংযুক্ত হয়ে যায়। তখন পায়ে হেটেই চলে যাওয়া যায়। সেখানে। এখানে কোন লোক বসতি নেই। এই অংশটি একেবারেই প্রবাল ময়। তবে মাঝে মাঝে লতাগুল্ম ও কেয়া গাছের ঝোপ দেখা যায়। এখানে স্বচ্ছ জলের নীচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারো ধরনের প্রবাল। নানান রংয়ের মাছেরা খেলা করে প্রবালের ফাঁকে। সত্যিই সে এক দেখার মত দৃশ্য।

downloadসেন্ট মার্টিনের মূল অংশ হতে ট্রলার বা স্পীড বোটে করে এখানে আসা যায়। তবে কারো যদি অদম্য শক্তি থাকে তবে সে পায়ে হেঁটেও আসতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় ২ ঘন্টা। তবে ট্রলারে করে দ্বীপের পাশ ঘেষে আসাটাই শ্রেয়। আসতে আসতে চোখে পরবে দ্বীপের দৃশ্যাবলী। প্রায় ৩০ মিনিট লাগে ট্রলারে কর আসতে। ছেড়া দ্বীপ আসতে চাইলে খুব সকাল করে ঘুম ঠেকে উঠে ট্রলার নিয়ে রওয়ানা দিতে হবে। না হলে পূর্ন জোয়ার হলে দ্বীপটিকে আর ভাল ভাবে দেখা যায় না।

বিভিন্ন পণ্যের পসরা নিয়ে দোকানিরা বসে থাকে এখানে সকাল হতেই। ডাব আর কোমল পানীয় যেমন আছে তেমন আছে অসাধারণ স্বাদের কাকড়া আর ফ্লায়িং ফিস ফ্রাই।

কালো রাজার সুরঙ্গ

এটি টেকনাফে অবস্থিত রহস্যময় একটি গুহা। বর্তমানে মানুষের আগ্রহের কারনে এই গুহা একটি ভাল মানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। এখানে যেতে হলে আপনাকে বাসে করে হেইখং বাজারে নামতে হবে। তার পর পায়ে হেঁটে যেতে হবে প্রায় ৬ কিলোমিটার পথ। এখানে বনবিভাগের তৈরি ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার পর কাঁচা রাস্তায় হাটতে হবে আরো ২ কিলোমিটার। এটি মূলত ঝিরি বা পাহাড়ি নালা পার হয়ে পৌঁছতে হবে কালো রাজার গুহায়।

কিভাবে যাবেন:

ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার থেকে বাস বা মাইক্রোবাসে করে যাওয়া যাবে ৯ কিমি.। টেকনাফের জাহাজ ঘাটে গিয়ে আপনাকে সী ট্রাকের টিকেট কাটতে হবে। টেকনাফ হতে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব। উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যেতে হয় এখানে। শীত মৌসুমে সাগর শান্ত থাকে তাই এই সময় এখানে যাওয়া অনেক বেশী নিরাপদ। এই পর্যটন মৌসুমে এখানে টেকনাফ হতে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত কেয়ারী সিন্দবাদ সহ বেশ কয়েকটি সী-ট্রাক চলাচল করে। সকাল ১০ টায় এই নৌযানটি সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং বিকাল ৩ টায় ফিরে আসে। তবে এছাড়াও ট্রলার ও স্পীড বোটে করে যাওয়া যায় সেন্ট মার্টন। সী ট্রাক গুলো এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলাচল করে। এর পর বৈরি আবহাওয়ার কারণে প্রশাসন একে চলতে দেয়না।

NO COMMENTS

Leave a Reply