কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শব-ই-বরাত

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শব-ই-বরাত


0 1523

আর মাত্র কয়েকদিন পরেই এদেশের মুসলমান ভাই ও বোনেরা উদযাপন করবেন শব-ই-বরাত। অধিকাংশ মুসলমান এই রাত কে ভাগ্য রজনী বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে থাকেন। এই বিশ্বাসের কারণে তারা দিনের বেলা রোজা ও রাতের বেলা নফল ইবাদত করে থাকে। যে ব্যক্তিটি সারা বছরে নামাজের ধারে কাছেও যায় না সেই ব্যক্তিটিকেও দেখা যায় মসজিদে গিয়ে (মহিলা হলে ঘরে বসে) সারারাত জেগে নামাজ পড়ছেন। উদ্দেশ্য একটাই – তার ভাগ্যে যাতে ভাল কিছু লেখা হয়। তার চাওয়াগুলো যেন আল্লাহ মিলিয়ে দেন। এ ছাড়া এই রাত উপলক্ষে হালুয়া-রুটি বানানো টা একটা ঐতিহ্য হয়ে গেছে। হালুয়া রুটি বানিয়ে একজন আরেক জনের বাসায় পাঠিয়ে থাকে। কয়েক বছর ধরে আতশবাজি বা বোমও ফোটানো হয় এবং মসজিদগুলোতে করা হয় আলোকসজ্জা ।

আমরা যারা শব-ই-বরাত উপলক্ষে এসব কাজগুলো করছি তারা কি কখনো অনুসন্ধান করে দেখেছি যে, ইসলাম শব-ই-বরাত সম্পর্কে কী বলে? একজন মুসলিম হিসেবে প্রতিটি ইবাদত করতে হবে হবে জেনে বুঝে। যেহেতু প্রতিটি ইবাদত সম্পর্কেই কোরান-হাদিসে স্পষ্ট করে বলা আছে। চলুন জেনে নেই শব-ই-বরাত সম্পর্কে।

‘শব’ ফারসি শব্দ যার অর্থ হল রাত বা রজনী। বরাত শব্দটিও মূলে ফারসি। অর্থ ভাগ্য। অর্থাৎ শব-ই-বরাত অর্থ ভাগ্য-রজনী। বরাত শব্দটি আরবি ভেবে অনেকেই ভুল করে থাকেন। কিন্তু ‘বরাত’ বলতে আরবি ভাষায় কোন শব্দ নেই। যদি বরাত শব্দটি আরবি বারা’আত শব্দের অপভ্রংশ ধরা হয় তবে তার অর্থ হবে— সম্পর্কচ্ছেদ বা বিমুক্তি করণ। কিন্তু কয়েকটি কারণে এ অর্থটি গ্রহণযোগ্য নয়:

১. আগের শব্দটি ফারসি হওয়ায় ‘বরাত’ শব্দটিও ফারসি হবে, এটাই স্বাভাবিক

২. শা’বানের মধ্যরজনীকে আরবি ভাষার দীর্ঘ পরম্পরায় কেউই বারা’আতের রাত্রি হিসাবে আখ্যা দেননি।

৩. রমযান মাসের লাইলাতুল ক্বাদরকে কেউ-কেউ লাইলাতুল বারা’আত হিসাবে নামকরণ করেছেন, শাবানের মধ্য রাত্রিকে নয়।

প্রশ্ন আসতে পারে আরবি ভাষায় এ রাতটিকে কি বলা হয়? আরবি ভাষায় এ রাতটিকে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা‘বান’ — শাবান মাসের মধ্য রজনী — হিসাবে অভিহিত করা হয়।

শাবান মাসের মধ্য রাত্রির ফযীলত সম্পর্কে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে যেগুলোর একটি বানোয়াট হাদিস বলে প্রমাণিত হয়েছে আর অন্যগুলো ইসলামিক স্কলারগণ দুর্বল হাদিস বলে আখ্যা দিয়েছেন।

১. আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আমি রাসূল (সা.) কে খুঁজে না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম, আমি তাকে বাকী গোরস্তানে পেলাম। তখন রাসূল (সা.) আমাকে বললেন: ‘তুমি কি মনে কর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর জুলুম করবেন?’ আমি বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি আপনার অপর কোন স্ত্রীর নিকট চলে গিয়েছেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন: ‘মহান আল্লাহ তা’লা শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন এবং কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশী লোকদের ক্ষমা করেন।

হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেন (৬/২৩৮), তিরমিযি তার সুনানে (২/১২১,১২২) বর্ণনা করে বলেন, এ হাদীসটিকে ইমাম বুখারী দুর্বল বলতে শুনেছি। অনুরূপভাবে হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৯) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির সনদ দুর্বল বলে সমস্ত মুহাদ্দিসগণ একমত।

২. আবু মূসা আল আশ’আরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা‘আলা শাবানের মধ্যরাত্রিতে আগমণ করে, মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যতীত, তাঁর সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন।” হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৫৫, হাদীস নং ১৩৯০),এবং তাবরানী তার মু’জামুল কাবীর (২০/১০৭,১০৮) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

আল্লামা বূছীরি বলেন: ইবনে মাজাহ বর্ণিত হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাবরানী বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে আল্লামা হাইসামী (রহ.) মাজমা‘ আয যাওয়ায়েদ (৮/৬৫) গ্রন্থে বলেনঃ ত্বাবরানী বর্ণিত হাদীসটির সনদের সমস্ত বর্ণনাকারী শক্তিশালী। হাদীসটি ইবনে হিব্বানও তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন।

৩. আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যখন শা‘বানের মধ্যরাত্রি আসবে তখন তোমরা সে রাতের কিয়াম তথা রাতভর নামায পড়বে, আর সে দিনের রোযা রাখবে; কেননা সে দিন সুর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন: ক্ষমা চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি ক্ষমা করব। রিযিক চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি রিযিক দেব। সমস্যাগ্রস্ত কেউ কি আছে যে আমার কাছে পরিত্রাণ কামনা করবে আর আমি তাকে উদ্ধার করব। এমন এমন কেউ কি আছে? এমন এমন কেউ কি আছে? ফজর পর্যন্ত তিনি এভাবে বলতে থাকেন”।

হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৮) বর্ণনা করেছেন। আল্লামা বূছীরি (রহ.) তার যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ (২/১০) গ্রন্থে বলেন, হাদীসটির বর্ণনা কারীদের মধ্যে ইবনে আবি সুবরাহ রয়েছেন যিনি হাদীস বানাতেন। তাই হাদিসটি বানোয়াট।

আমরা যদি উপরে উল্লিখিত প্রথম ও দ্বিতীয় হাদিসটি পাঠ করে দেখি তাহলে দেখতে পাব —আল্লাহ তায়ালা নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহবান জানাতে থাকেন — হাদিসদ্বয়ে এ বক্তব্যই উপস্থাপিত হয়েছে। মুলত সহীহ হাদীসে সুস্পষ্ট এসেছে যে, “আল্লাহ তায়ালা প্রতি রাতের শেষাংশে – শেষ তৃতীয়াংশে- নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হয়ে আহবান জানাতে থাকেন, এমন কেউ কি আছে যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? এমন কেউ কি আছে যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে দেব? আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?” (বুখারী, হাদীস নং ১১৪৫, মুসলিম হাদীস নং ৭৫৮)

কাজেই আট দশটা সাধারণ রাতের সাথে শব-ই-বরাত তথা ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান’ এর কোন পার্থক্য নেই।

তবে ইসলামিক স্কলারগণ এ ব্যাপারে একমত যে, দুর্বল হাদীসের উপর আমল যায়। কিন্তু আমল করার জন্য কয়েকটি শর্ত প্রয়োজন। শর্তগুলো হল :

১. হাদিসটির মূল বক্তব্য অন্য কোন সহীহ হাদীসের বিরোধীতা করবেনা, বরং কোন শুদ্ধ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

২. হাদিসটি একেবারেই দুর্বল অথবা বানোয়াট হলে চলবে না।

৩. হাদিসটির উপর আমল করার সময় এটা রাসূল (সা.) থেকে প্রমাণিত বলে বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ রাসূল থেকে প্রমাণিত বলে বিশ্বাস করলে রাসূলের উপর মিথ্যাচারিতার পাপ হবে, ফলে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে পড়বে।

৪. হাদিসটি ফাদায়িল তথা কোন আমলের ফযীলত বর্ণনা সংক্রান্ত হতে হবে। আহকাম (ওয়াজিব, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরূহ) ইত্যাদি সাব্যস্তকারী না হতে হবে।

৫. বান্দা ও তার প্রভুর মাঝে একান্ত ব্যক্তিগত কোন আমলের ক্ষেত্রে হাদীসটির নির্ভরতা নেয়া যাবে। তবে এ হাদীসের উপর আমল করার জন্য একে অপরকে আহবান করতে পারবে না।

এই শর্তাবলীর আলোকে উপরোক্ত হাদীস গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, উপরোক্ত হাদীস সমূহের মধ্যে শেষোক্ত _ আলী (রা.)বর্ণিত — হাদিসটি বানোয়াট। সুতরাং তার উপর আমল করা উম্মাতের আলেমদের ঐক্যমতে জায়েয হবে না। আর অন্যান্য হাদিসগুলোতে বর্ণিত আমলের বাইরে মনগড়া কিছু করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। যেমন ফজিলতের আশায় শুধুমাত্র শা‘বানের পনের তারিখ রোযা রাখা বিদ‘আত হবে। কারণ শরীয়তে এই একদিন রোযা রাখা কোন ভিত্তি প্রমাণিত হয় নাই। 

তবে রাসূল  (সা.) থেকে বহু সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি শা‘বান মাসে সবচেয়ে বেশী নফল রোযা রাখতেন। [বুখারী, হা/১৯৬৯, ১৯৭০; মুসলিম হা/১১৫৬, ১১৬১; মুসনাদে আহমাদ ৬/১৮৮, সুনানে আবু দাউদ, হা/২৪৩১, সহীহ ইবনে খুযাইমা হা/২০৭৭, সুনানে তিরমিঝি, হ/৬৫৭]। সে হিসাবে যদি কেউ শা‘বান মাসে রোযা রাখেন তবে তা হবে সুন্নাত। শাবান মাসের শেষ ২/১ দিন ছাড়া বাকী যে কোন দিন রোযা রাখা জায়েয বা সওয়াবের কাজ। তবে রোজা রাখার সময় মনে করতে হবে যে, রাসূল  (সা.) যেহেতু শা‘বান মাসে রোজা রেখেছিলেন তাকে অনুসরন করে রোযা রাখা হচ্ছে। অথবা যদি কারও আইয়ামে বীযের নফল রোযা তথা মাসের ১৩,১৪,১৫ এ তিন দিন রোযা রাখার নিয়ম থাকে তিনিও রোযা রাখতে পারেন। কিন্তু শুধুই ফজিলতের আশায়  শা‘বানের পনের তারিখ রোযা রাখা বিদ‘আত হবে।

অন্যদিকে একে ভাগ্য রজনী বলে বিশ্বাস করাটাও হবে গুনাহের কাজ। একে ভাগ্য রজনী বলে প্রমাণ করতে সূরা আদ-দুখানের ৩ ও ৪ আয়াত দু’টির ভূল ব্যাখ্যা করা হয়। আয়াতদ্বয়ের অর্থ হল, “অবশ্যই আমরা তা (কোরআন) এক মুবারক রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি, অবশ্যই আমরা সতর্ককারী, এ রাত্রিতে যাবতীয় প্রজ্ঞা পূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়”।

কিন্তু এ আয়াত দ্বারা রমযানের লাইলাতুল ক্বাদরক বুঝানো হয়েছে। যে লাইলাতুল কাদরের চারটি নাম রয়েছে: ১. লাইলাতুল কাদর, ২. লাইলাতুল বারা’আত, ৩. লাইলাতুচ্ছফ, ৪.লাইলাতুল মুবারাকাহ।

কেননা আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, “আমরা এ কোরআনকে ক্বাদরের রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি।” (সূরা আল-কাদরঃ১)

আল্লাহ আরও বলেন, “রমযান এমন একটি মাস যাতে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।” (সূরা আলবাকারাহঃ১৮৫)

কাজেই শব-ই-বরাতকে ভাগ্য রজনী ভাবা যাবে না। আর এই রাতকে উপলক্ষ করে হালুয়া-রুটি বানানো বা বিতরণ, আতশবাজি বা বোমও ফোটানো এবং মসজিদগুলোতে আলোকসজ্জা করাটা সম্পূর্ণরূপে বিদাত। আল্লাহর ইবাদত ভেবে এসকল বিদআতি কাজ করলে আমরা কখনই আল্লাহকে খুশি করতে পারবো না। বরং এতে করে আল্লাহর আজাবকেই ত্বরান্বিত করা হয়। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদের আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল (দ্বীনের মধ্যে) নব উদ্ভাবিত বিষয়। আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক বিষয় বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত হল ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম। ।”

NO COMMENTS

Leave a Reply