কার স্বার্থে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র?

কার স্বার্থে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র?


0 1227

প্রতীক বর্ধন
সুন্দরবনের কাছে রামপালে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাদের কথা হচ্ছে, এটা হলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে, প্রকৃতি ধ্বংস হবে। অন্যদিকে সরকার বলছে, এই প্রকল্পে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না। সরকার আমাদের আশ্বস্ত করেছিল, এ প্রকল্পে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নাগরিকদের মনে শঙ্কা ছিলই, বনের পাশে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, অথচ বনের ক্ষতি হবে না, সেটা কীভাবে সম্ভব।

এবার সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি ও ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) যৌথ সমীক্ষায় জানা গেল, এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি ৬২ শতাংশের বেশি হবে। এই প্রকল্পের জন্য সরকার ইতিমধ্যে যে ১৫ বছরের জন্য কর মওকুফ করেছে, তার আর্থিক মূল্য ৯৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। এ ছাড়া কয়লা আনা-নেওয়ার জন্য নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয় হবে।

অর্থাৎ এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যদি বিরাজমান হারে জনগণকে দিতে হয়, তাহলে সরকারকে বিপুল পরিমাণ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। পাশাপাশি, কর ছাড়ের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হবে। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে একরকম মরিয়া।

উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের বিকল্প নেই, আর বিনিয়োগের প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে যদি সরকারের এ পরিমাণ টাকা ক্ষতি হয়, তাহলে সে বিদ্যুৎ দিয়ে কী হবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। আর তার সঙ্গে পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতির ব্যাপারটি তো আছেই। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনের হিসাব যে একদম শতভাগ ঠিক, তা হয়তো নয়। কিন্তু এটা বাস্তবায়ন করলে সরকার যে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়বে, সে বিষয়ে তো নিশ্চয়ই কারও দ্বিমত নেই।

উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে গেলে পরিবেশের ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী। অন্য কথায়, মানুষ যা-ই করুক না কেন, তাতে পরিবেশের ক্ষতি হয়ই। পশ্চিমে যখন উন্নয়ন হয়েছে, তখন পরিবেশ ক্ষতির ব্যাপারটা এতটা জোরালো ছিল না। ফলে তারা প্রকৃতির সঙ্গে যথেচ্ছাচার করেছে। এখন আমাদের উন্নয়নের সময়। কিন্তু তাই বলে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে যথেচ্ছাচার করব, তা নয়। নানা কারণে সেটা সম্ভবও নয়। কথা হচ্ছে, আমাদের সামনে কয়েক শ বছরের অভিজ্ঞতা আছে, সেখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। প্রকৃতির যত কম ক্ষতি করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়, ততই মানবজাতির মঙ্গল।

অথচ সরকার এ রকম একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রামপালের মতো সুন্দরবনের নিকটবর্তী একটি স্থান কেন বেছে নিল, সেটা আমাদের বোধগম্য হলো না। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পরিবেশবাদীরা সারা পৃথিবীতেই সোচ্চার। আবার আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা করতে পারব, সেটা নিয়েও সংশয় আছে। এমনিতেই জাতিগতভাবে আমাদের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা খুবই নিম্নমানের। আবার এই প্রকল্পে যে কথিত সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক উন্নত প্রযুক্তি এখন পৃথিবীতে আছে। অন্যদিকে ভারতও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসবে বলে খবর আছে। এমনকি কিছুদিন আগে ভারতের পাঞ্জাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রুফটপ (ছাদ) সৌর বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট উদ্বোধন করা হয়েছে।

কয়লা থেকে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়। অন্যদিকে যে স্থানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি—আইলা ও সিডর ওই এলাকার ওপর দিয়েই গেছে। এরপর আমরা জানতে পারলাম, এই প্রকল্পটি আর্থিকভাবেও সরকারের জন্য লাভজনক হবে না। ফলে সরকারকে জানাতে হবে, এত কিছু সত্ত্বেও তারা কেন এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে চায়?

NO COMMENTS

Leave a Reply