এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধার সিলেট আগমন ও বঙ্গে ইসলামের প্রসার

এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধার সিলেট আগমন ও বঙ্গে ইসলামের প্রসার


0 2041

বাংলা গ্যাজেট ডেস্ক: বাংলাদেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষগুলোর জন্য একটি চমৎকার ও ঐতিহ্যমণ্ডিত দর্শনীয় স্থান হল সিলেটে অবস্থিত হযরত শাহজালাল (রহ.) এর পবিত্র মাজার শরীফ। তবে সেখানকার ভন্ড খাদেমদের দৌরাত্ম্যে দর্শনার্থীরা একদিকে যেমন বিরক্তিতে পরেন তেমনি বিভ্রান্তিরও শিকার হন। মুনাফালোভী এসকল তথাকথিত খাদেম হযরত শাহজালাল (রহ.) এর নাম ভাঙিয়ে করছে রমরমা ব্যবসা। তাঁর কবরকে নিয়ে চালাচ্ছে নানারকম শিরকি কর্মকাণ্ড। যদিও হজরত শাহজালাল (রহ.) কিংবা ইসলামের আকিদা এসব কাজকে সর্বাবস্থায়ই নিরুৎসাহিত করে।

আমরা অনেকেই জানি না শাহজালাল (রহ) এর সিলেট আগমনের ইতিহাস। আজকের আয়োজন তাঁর সিলেট আগমন নিয়েই। চলুন জেনে নেই এই মহান ব্যক্তি, ইসলামের অন্যতম সেনাপতি হযরত শাহজালাল (রহ) এর সিলেট আগমণের ইতিহাস।

তখন বিশ্বে মুসলিমদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত। ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফতের পতাকা বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূমিতে পৌছে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে খিলাফাহ রাষ্ট্রের সেনবাহিনীই জিহাদের মাধ্যমে কাফিরদের ভূমি ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। তবে অনেক সময় আবার সাধারণ মুসলমানেরাও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নানান দেশে ইসলাম প্রচার করতেন।

ভারতবর্ষে মুসলমান বণিকদের আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের সুমহান বাণী প্রসার লাভ করতে থাকে। ইতিহাসে জানা যায়, অস্টম শতক থেকে বাংলাদেশে মুসলমান বণিকদের আগমন শুরু হয়। এসময়ই বাংলার মাটিতে আগমন ঘটে আল্লাহ’র অলি হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী (রহঃ)এর। এরপর থেকে বাংলা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আল্লাহপাকের শান্তির বাণী ইসলাম। নবম/দশম শতকে বাংলায় মুসলমানদের উপস্থিতির কথা আরব পর্যটকগণও তাঁদের রচনায় লিপিবদ্ধ করেছেন।

হযরত শাহজালাল (রহঃ) আরবের দক্ষিণে অবস্থিত ইয়েমেন রাজ্যে হাডরামন্টের কুনিয়া শহরে আনুমানিক ৫৯৭ হিজরি মোতাবেক ১১৯৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, তিনি তুরস্কের কোনা শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে অধিকাংশের মতে, তিনি ইয়েমেনেই জন্মগ্রহণ করেন। হিজরি ষষ্ঠ শতকের শেষাংশে মক্কার কোরায়েশ বংশের একটি শাখা মক্কা শহর থেকে হেজাজ ভূমির দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে ইয়েমেন প্রদেশে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। এই শাখারই একজন বংশধর হলেন হযরত শাহ্জালাল (রহঃ)এর পিতা শায়খ মুহম্মদ। তিনি প্রখ্যাত সূফী জালাল আদ্ দ্বীন মুহম্মদ রুমী (রহঃ)-এর সমসাময়িক ছিলেন। আর সৈয়দা ফাতিমা হাসিনা সাইদা হলেন হযরত শাহ্জালাল (রহঃ)এর মাতা। তিন মাস বয়সে তিনি তাঁর স্নেহময়ী মাকে হারান। পাঁচ বছর বয়সে বাবাকেও হারান। পিতৃ-মাতৃহারা শাহজালালের দায়িত্ব নেন মামা হযরত সৈয়দ শায়েখ আহমদ কবির সুরাওয়ার্দী (রহঃ)। আধ্যাত্মিক এই সাধকের আস্তানা ছিল মক্কা শহরে। তাই তিনি শিশু শাহজালালকে সঙ্গে করে মক্কায় নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অন্যান্য শিষ্যদের সঙ্গে শিশু শাহজালালকেও শিক্ষাদীক্ষা দান করতে থাকেন।

হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার
হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার

কালক্রমে হযরত শাহজালাল (রহঃ) কোরআনে হাফেজ হন। তিনি নিজ মুর্শিদ হযরত সৈয়দ শায়েখ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি (রহঃ)এর কাছে ইসলামি দর্শন ও তত্ত্বশাস্ত্রে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি জাহেরি জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ধ্যান সাধনার মাধ্যমে বাতেনি জ্ঞানও অর্জন করেন। ত্রিশ বছর বয়সেই তিনি আধ্যাত্মিক সূফী জ্ঞানে কামালিয়াত বা পরিপূর্ণতা অর্জন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনের অনেক আগেই তিনি উচ্চ স্থানীয় আধ্যাত্মিক সূফী সাধক বা কামেল অলি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহঃ) একদিন স্বপ্নযোগে রাসুলে পাক (দঃ)এর পক্ষ থেকে তৎকালীন ভারতবর্ষের গৌড় রাজ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য আদেশপ্রাপ্ত হন। হযরত শাহজালাল (রহঃ) এই স্বপ্নের কথা তাঁর শিক্ষক হযরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহঃ)কে বলেন।

হযরত শাহ্জালাল স্বীয় শিক্ষকের আদেশ পেয়ে ১২ জন সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে হিন্দুস্তানের উদ্দেশে রওনা হন। তবে মক্কা ত্যাগের আগে জন্মভূমিকে শেষবারের মতো দেখার জন্য তিনি সহচরদেরকে নিয়ে নিজ পূর্বপুরুষের ভূমি ইয়ামেনে যান।

এরপর হযরত শাহজালাল (রহঃ) ইয়েমেন থেকে বাগদাদে যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর পারস্য শহরে গমন করেন। পারস্য থেকে তিনি আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান হয়ে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে পৌঁছান। ভারতে পৌঁছার পর তিনি হযরত খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রহঃ)-এর [১১৪১-১২৩০] কবর জিয়ারত করেন। পরবর্তীতে তিনি সুলতানুল মাশায়েখ হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া (রহঃ)-এর [১২৩৮-১৩২৫] আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।

তৎকালীন বাংলা ভূখণ্ডের শ্রীহট্ট বর্তমানের সিলেটের অধিপতি রাজা গৌড়গোবিন্দ জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ও মুসলিম বিদ্বেষী শাসক ছিলেন। বর্তমান সিলেট শহরের পূর্বদিকে টোলটিকর নামক স্থানে শেখ বুরহানউদ্দিন নামক একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির বসবাস ছিল। তিনি একবার সন্তান প্রাপ্তির আশায় একটি গরু কুরবানির মানত করেন এবং আল্লাহ তাকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন। আনন্দে ভরে যায় শেখ বুরহানউদ্দিনের সংসার। কিন্তু সর্বদা মনে রাখতে হবে, জগতের সকল সুখ-দুঃখ আল্লাহপাকের তরফ থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। মানুষের সুখ-দুঃখে আপতিত হবার পেছনে আল্লাহর নিগূঢ় উদ্দেশ্য লুকায়িত থাকে। যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝতে পারা কঠিন। তাইতো পুত্র প্রাপ্তির পর শেখ বুরহানউদ্দিনের সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। মানত অনুযায়ী তিনি গরু কুরবানি করেন। একটি চিল কুরবানির করা গরুর এক টুকরো গোশত ছোঁ দিয়ে নিয়ে উড়ে চলে যায়। ঘটনাক্রমে তা গৌড়গোবিন্দের প্রাসাদের সামনে পড়ে। এতে রাজা ক্রোধান্বিত হয়ে গো-হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। অনুসন্ধানকারীরা শেখ বুরহান উদ্দিনকে রাজার সামনে হাজির করে। শেখ বুরহান উদ্দিন অকপটে গরু কুরবানির কথা স্বীকার করে। তখন গো-হত্যার বিরুদ্ধ রাজা তার ডান হাত কেটে নেয়ার এবং শিশু সন্তানটিকে হত্যা করার আদেশ দেন।

হযরত শাহজালাল (রহ.) এর কবর
হযরত শাহজালাল (রহ.) এর কবর

এই ঘটনার পর থেকে অশান্তি আর মানসিক যন্ত্রণা তাড়া করে বেড়াতে লাগলো শেখ বুরহান উদ্দিনকে। পুত্রশোকে কাতর পাগলপ্রায় শেখ বুরহান উদ্দিন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিনের দরবারে উপস্থিত হয়ে রাজা গৌড়গোবিন্দের অত্যাচারের নির্মম কাহিনী বর্ণনা করে নালিশ জানান। সুলতান করুণ এই কাহিনী শুনে বড়ই মর্মাহত হলেন। অত্যাচারী রাজাকে উপযুক্ত শাস্তি দেবার জন্য স্বীয় ভগ্নি পুত্র সেকান্দার শাহকে প্রধান করে সৈন্য পাঠান শ্রীহট্টে। তবে সেকান্দার শাহের বাহিনী শ্রীহট্টে পৌঁছার আগেই রাজা গৌড়গোবিন্দ তাদের ওপরে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করেন। এ ধরনের কোন আক্রমণ আসতে পারে সেটা দিল্লির সুলতানের সৈন্যরা ধারণাও করতে পারে নাই। ফলে পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় বহু সৈন্য নিহত হয়। সেকান্দার শাহ্ এ অবস্থা দেখে নিজ সৈন্যবাহিনী নিয়ে পশ্চাৎপসরণ করে। এরপর আরো দু’বার শ্রীহট্ট আক্রমণ করেও তিনি সফল হতে পারলেন না। এ সার্বিক পরিস্থিতি তিনি দিল্লির সম্রাটকে অবহিত করেন। এরপর সেকান্দার শাহকে সহযোগিতা করার জন্য দিল্লির সম্রাট সৈয়দ নাসিরউদ্দিন শাহকে প্রেরণ করেন। আদেশ অনুযায়ী সৈয়দ নাসিরউদ্দিন শাহ্ তিনি দিল্লি থেকে এলাহাবাদে পৌঁছালে হযরত শাহজালাল (রহঃ)এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সৈয়দ নাসিরউদ্দিন হযরত শাহজালাল (রহঃ)এর কাছ সঙ্গী হন। হযরত শাহজালাল (রহঃ) ইয়েমেন থেকে ১২ জন সঙ্গী নিয়ে রওনা করলেও চলতি পথে অনেকে তাঁর সঙ্গী হয়ে যায়। সকলে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। ফলে শ্রীহট্ট পৌঁছার সময় তাঁর সঙ্গীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৬০ জনে।

হযরত শাহজালাল (রহঃ) ৩৬০ জন সঙ্গী এবং বাদশাহের পাঠানো সেনাদল নিয়ে সোনারগাঁওয়ে অবস্থান নেয়া সেকান্দার শাহের সঙ্গে মিলিত হন। তিনি হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর পরিচয় পেয়ে শ্রীহট্টের ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। বিশেষ করে তিনি জানান, গৌড়গোবিন্দের অগ্নিবাণই তাদের পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল। সব শুনে হযরত শাহজালাল (রহঃ) ‘কোন ভয় নেই’ বলে সেকান্দার শাহকে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, হযরত মুসা (আঃ) যেভাবে ফেরাউনের সব জাদু মন্ত্রকে নিষ্ক্রিয় করেছিলেন, আল্লাহর রহমতে আমরাও গৌড়গোবিন্দের জাদু নষ্ট করে দেবো। তার কর্মের জন্য তার পরাজয় অনিবার্য ও সিংহাসন চ্যুতি সুনিশ্চিত।

তাঁরা রওনা হলেন শ্রীহট্ট আক্রমণের জন্য। গৌড়গোবিন্দের কাছে খবর পৌঁছলো, এক মুসলিম ব্যক্তি তাঁর সঙ্গি ও সেকান্দার শাহের সৈন্য বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তার এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। এ খবর পেয়ে গৌড়গোবিন্দ ওই বাহিনীর দিকে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করতে থাকেন। কিন্তু এবারের অগ্নিবাণে কোন কার্যকর ফল দেখতে পেলেন না গৌড়গোবিন্দ। বরং দেখতে পেলেন অগ্নিবাণ উল্টো দিকে ফিরে এসে তার নিজের সৈন্যবাহিনীর ছাউনিই ধ্বংস করে দিল। এই ঘটনা দেখে অত্যাচারী রাজা নিজের প্রাণরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে হযরত শাহজালাল (রহঃ) সদলবলে বাহাদুরপুরের নিকটবর্তী বুরাক নদী পার হয়ে জালালপুরে উপনীত হলেন। রাজা পথিমধ্যে বিভিন্ন শিলাপাথর ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে বাঁধা তৈরী করেও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। তখন নিজের পরাজয় মেনে নিয়ে রাজা কাছাড়ের দিকে পালিয়ে যান। হযরত শাহজালাল (রহঃ) সুরমা নদী পার হয়ে শ্রীহট্ট বা সিলেট শহরে প্রবেশ করলেন।

সিলেট বিজয়ের পর হযরত শাহজালাল (রহঃ) সেকান্দার শাহকে রাজ্য বুঝিয়ে দিল। এরপর তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য সিলেটে আস্তানা গড়ে তোলেন।

এরপর থেকে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সাহচার্য পাওয়ার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসতে শুরু করল। তিনি এসব মানুষকে ইসলাম ধর্ম ও জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানদান করেন। একই সঙ্গে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনার্থে তিনি তাঁর সঙ্গীদের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম প্রচারের আদেশ দিয়ে পাঠিয়ে দেন। এরমধ্যে হযরত শাহ পরান (রহঃ) সিলেটে, হযরত শাহ মালেক (রহঃ) ঢাকায়, সৈয়দ আহমদ (রহঃ) ওরফে কল্লা শহীদ কুমিল্লায়, হযরত খাজা বুরহান উদ্দিন কাত্তান (রহঃ) ও হযরত শাহ বদরুদ্দীন (রহঃ) চট্টগ্রামে, হযরত শাহ্ কামাল কাত্তানী (রহঃ) সুনামগঞ্জে প্রেরণ করেন।

উল্লেখ্য হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সঙ্গে ৩৬০ জন সঙ্গী হিসেবে যারা এসেছিলেন তাদের সকলের নাম জানা সম্ভব না হলেও ১৯৭৪ সালে ইংরেজি ভাষায় সিলেট ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ৩৫৫ জনের নাম সম্বলিত একটি তালিকা প্রকাশিত হয়। ‘শ্রীহট্ট নূর’ গ্রন্থে ৩০৭ জন আউলিয়ার নাম পাওয়া যায়। মর্তুজা আলী ‘সুহেল ই ইয়ামেন’-এ ২৫২ জন আউলিয়ার নাম উল্লেখ করেন। আল ইসলাহে মোঃ নুরুল হক ৩২২ জন আউলিয়ার নাম উল্লেখ করেন।

হযরত শাহজালাল (রহঃ) তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত ইসলাম প্রচার করে গেছেন। তার অতুলনীয় ব্যবহার ও অন্যান্য গুণাবলির দিকে আকৃষ্ট হয়ে বহু হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ ইসলামের শান্তির বাণী গ্রহণ করেন। বিশ্বের নামকরা পর্যটক মরক্কো তানজানিয়ার অধিবাসী শায়খ সরফ উদ্দিন আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেট সফরে এসে হযরত শাহজালাল (রহঃ)এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। ইবনে বতুতা সিলেটকে কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ও সমুদ্র তীরবর্তী একটি গহিন বনাঞ্চল বলে উল্লেখ করেন। তার বর্ণনা থেকে আরো জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহঃ) পাতলা গড়নের, খুবই সুন্দর চেহারার অধিকারী এবং বেশ লম্বা ছিলেন। তিনি ছাগলের দুধ পান করতেন। সারা বছরই বলতে গেলে তিনি রোজা রাখতেন। সারা রাত এবাদতে মশগুল থাকতেন। ইবনে বতুতা ‘রিহালা ইবনে বতুতা’য় হযরত শাহজালাল (রহঃ)এর সঙ্গে সাক্ষাতের বিভিন্ন বর্ণনা প্রদান করেন। মোগল কবি হযরত আমির খসরুর কবিতার বইয়েও হযরত শাহজালাল (রহঃ)এর সিলেট বিজয়ের উল্লেখ রয়েছে।

হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর মৃত্যুবরণের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। তবে ইবনে বতুতার বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল (রহঃ) ১৫০ বছর বয়সে ৭৪৭ হিজরি, ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান বলে জানা যায়। তাঁকে সিলেটেই সমাহিত করা হয়।

পরিশেষে: ইসলামের আদর্শকে রক্ষা করার জন্য যিনি যুদ্ধ করেছিলেন এক অত্যাচারী হিন্দু শাসকের সাথে এবং নিজের জীবন যিনি ব্যয় করেছেন ইসলামকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সেই হযরত শাহজালাল (রহ.) এর কবর নিয়ে ব্যবসা করা কারোরই কাম্য নয়। এসকল ভণ্ডরা মূলত মুসলমানদেরকে হযরত শাহজালালের (রহ.) প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। হযরত শাহজালালের (রহ.) কবরে গিয়ে সুতা বেঁধে বা মানত করে শিরকি কর্মকাণ্ড না করে বরং প্রতিটি মুসলিম ও প্রতিটি দর্শনার্থী অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার শিক্ষা নিতে পারেন।

NO COMMENTS

Leave a Reply