ইসলামী শাসনামলের অনবদ্য কীর্তি: ষাট গম্বুজ মসজিদ

ইসলামী শাসনামলের অনবদ্য কীর্তি: ষাট গম্বুজ মসজিদ

বাংলা গ্যাজেট ডেস্ক: একশত বছর পূর্বেও বিশ্বকে শাসন করেছে মুসলিমরা। ব্রিটিশদের চক্রান্তে ১৯২৪ সালে প্রায় সাড়ে তেরশত বছরের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা খিলাফত রাষ্ট্রের পতন হয়। কিন্তু নানা স্মৃতি, ঐতিহ্য আর নিদর্শন এখনো বিশ্ববাসীকে খিলাফতের সময়কার ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রহঃ) এর মাজার তেমনি একটি নিদর্শন যা দেখলে মনে পড়ে যায় ইসলামী শাসনামলের কথা।

যদিও বাগেরহাট জেলায় রয়েছে অনেক বছরের প্রাচীন মঠ, মন্দির, মসজিদ ও সমাধিসৌধ। তবে যে কারণে বাগেরহাট জেলার খ্যাতি জগৎব্যাপী, তা হচ্ছে খান জাহান আলীর মাজার এবং ষাট গম্বুজ মসজিদ। এগুলোর নির্মাতা ছিলেন খান জাহান আলী (রহঃ)। ভ্রমণপিপাসুরা সময় করে ঘুরে আসতে পারেন খান জাহান আলী (রহঃ) এর বাগেরহাট থেকে, উপভোগ করতে পারেন মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন।

মসজিদের বাহরএকটি তথ্য হয়ত অনেকেই জানেন না। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের মধ্যে বাংলাদেশে যে তিনটি স্থান আছে তার মধ্যে দুটির অবস্থানই এই বাগেরহাটে। এর একটি সুন্দরবনের সংরক্ষিত অংশ, অন্যটি খান জাহান আলী (রহঃ) এর কীর্তি। ইউনেস্কো ১৯৮৯ সালে বাগেরহাট শহরের আশেপাশে অবস্থিত সুলতানি আমলে নির্মিত পুরাকীর্তি গুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে ঘোষণা করে। অনেকে শুধু মাত্র ষাটগম্বুজ মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে খান জাহান আলী (রহঃ) এর আমলে নির্মিত সব পুরাকীর্তিই এর অন্তর্ভুক্ত।

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সন্নিবেশ করা হল যাতে ভ্রমণ করতে যেয়ে আপনারা ইতিহাসকে জীবন্তরূপে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।

খান জাহান আলী (রহঃ) আগমনের ইতিহাস:

ভারত ছিল ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা খিলাফতের একটি বিশাল প্রদেশ। খান জাহান আলী (রহঃ) প্রথম জীবনে এই প্রদেশের দিল্লিতে উচ্চ রাজপদে নিয়োজিত ছিলেন। পনের শতকের গোড়ার দিকে তাকে প্রেরণ করা হয়েছিল দক্ষিণবঙ্গ জয় করে সেখানে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করতে। তিনি দক্ষিণবঙ্গের বিশাল এলাকা জয় করেন এবং তৎকালীন গৌড়ের সুলতান নাসিরুদ্দিন মহমুদ শাহের সম্মানে বিজিত রাজ্যের নাম রাখেন খলিফাতাবাদ (যার অর্থ প্রতিনিধির শহর)। বাগেরহাট সুন্দরবনের অংশ। একসময় ঘন তা জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। ১৫ শতকে তিনি(খান ই জাহান উলুঘ খান) উক্ত জঙ্গল পরিষ্কার করে এই শহরের পত্তন ঘটান এবং সেখানে ইসলামী শাসন কায়েম করেন।

পিছনের প্রাচিরএ দেশে আসা রাজ্যজয়ী শাসক কিংবা ইসলামের বাণী প্রচার করতে আসা পীর ফকির ও দরবেশদের মধ্যে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তার চরিত্রে বহু গুনের সমন্বয় ঘটেছিল। রাজ্য শাসন ছিল তার দায়িত্ব, ইসলামের বাণী প্রচার ছিল তার কর্তব্য, প্রজার কল্যান ছিল তার লক্ষ্য এবং শিল্পসমৃদ্ধ স্থাপনা নির্মাণ ছিল তার আনন্দ। বস্তুত তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত নির্মাতা। সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের পথে-প্রান্তরে রয়েছে তার অসংখ্য কীর্তিমাখা নির্দশন।

ভ্রমন করবেন যেভাবে:

রাজধানীর সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় বাগেরহাটের উদ্দেশে বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছাড়ে। বাগেরহাট এসে থাকবার জন্য বিভিন্ন মানের ভাল হোটেল রয়েছে বাগেরহাট শহরে।

বাগেরহাট শহরের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব পুরাকীর্তি দেখতে যানা আসেন তাদের কাজে সহযোগিতা করে থাকে খানজাহান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। ঠিকানা- হরিণখানা উত্তরপাড়া, ডাকঘর- পিসি কলেজ, বাগেরহাট। ফোনঃ ০৪৬৮-৬৩২৯৪, ০১৭১১-১২০৯৯০।

ভ্রমণের স্থানসমূহ:

ষাট গম্বুজ মসজিদ

খান জাহান আলী (রহঃ) আনুমানিক ১৪৫০ সালে এই মসজিদটির নির্মাণ করেন। তিনি দিল্লি থেকে যেসব দক্ষ কারিগর সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের দ্বারাই এই অপূর্ব মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। এতে ব্যবহৃত পাথর তিনি বহু দূর দেশ থেকে সংগ্রহ পেছনের গেটকরেছিলেন। এই মসজিদটি নির্মান করতে সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর। এই মসজিদটি বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম স্থাপত্যের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরন। এই মসজিদটি খান জাহানের অমর কীর্তি। সাধারণত এই মসজিদকে ষাট গম্বুজ মসজিদ বললেও এতে রয়েছে মোট ৮১ টি গম্বুজ। মসজিদের ভেতরে রয়েছে ৬০ টি স্তম্ভ। পাথরের বড় বড় টুকড়া দিয়ে এই স্তম্ভগুলো নির্মান করা হয়েছে। সংস্কারের ফলে এখন এই পাথরগুলো দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রাচীর দিয়ে এই মসজিদটি ঘেরা। ভেতরে সবুজ লন ও ফুলের বাগান দেখতে পাবেন। মসজিদের মূল প্রবেশ পথটিও বেশ আকর্ষনীয়। এ মসজিদকে খান জাহান আলী (রহঃ) দরবার কক্ষ হিসাবেও ব্যবহার করতেন বলে শোনা যায়, পশ্চিম দিকের দরজাটি সে ধারণাকে সমর্থন করে। আশির দশকে ইউনেস্কো এই মসজিদটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষনা করে। মসজিদের পশ্চিম দিকেও একটা দীঘি রয়েছে, নাম ঘোড়া দিঘি।

মাজার ও খাঞ্জেলি দীঘি

বাগেরহাট শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে এবং খুলনা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিন-পূর্বে খান জাহান আলী (রহঃ) এর মাজার অবস্থিত। দূর থেকে স্থানটি টিলার মতো উঁচু মনে হবে। ধারনা করা হয় খাঞ্জালি দীঘিটি খননের ফলে যে বিপুল মাটির rezaul_riaz_1346160934_2-SAM_0937__Small_স্তুপ জমা হয়, তার ওপর এই স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এই মাজারের প্রবেশপথ রয়েছে দুটি। পূর্বদিকের প্রবেশপথটি কারুকার্যময়। তবে সব সময় বন্ধ থাকে। দক্ষিনের প্রবেশপথটি সব সময় খোলা থাকে। বর্তমানে এই সমাধিটি খানজাহান আলী (রহঃ) মাজার কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। মাজারের নিচের দিকটি পাথরে নির্মিত। এই এলাকা লবনাক্ত বলে দূরদর্শী খান জাহান আলী (রহঃ) মাজারের নিচের দিকে যাতে মরিচা না ধরে সে জন্য এমন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেছেন। ভেতরে প্রবেশ করলে খান জাহান আলী (রহঃ) কবরটি কালো পাথরে নির্মিত, তাতে ফার্সি ভাষায় বিভিন্ন উদ্ধৃতি লেখা রয়েছে। এর সমাধিসৌধের পশ্চিমে রয়েছে প্রধান খাদেম তাদের ঠাকুরের সমাধি। আর এর পেছনে সমাধিসৌধের বাইরে রয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি বিশাল মসজিদ। নির্মাণকাল ১৪৫০ সাল। এই মসজিদে তিনি আলী জুমার নামাজ পড়তে আসতেন। নামাজ শেষে এখানে বিচারকাজ করতেন। খান জাহান আলী (রহঃ) এই মসজিদটি ও সমাধিসৌধটি মৃত্যুর (মুত্য ২৫ অক্টোবর, ১৪৫৯ সাল) দশ বছর পূর্বে নির্মাণ করেছিলেন। সমাধিসৌধটি নির্মাণ করে তিনি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। রাজ্য শাসন এবং ধর্ম প্রচারের জন্য এ দেশে ব্যক্তিদের মধ্যে এমন দৃষ্টিনন্দন সমাধিসৌধ আর দেখা যায়না।

খান জাহান আলী (রহঃ) মাজারের দক্ষিন দিকে রয়েছে এই বিশাল দীঘিটি। তিনি মোট ৩৬০ টি দীঘি খনন করেছিলেন, তাদের মধ্যে এই দিঘিটি সর্ববৃহৎ। প্রায় ৪০ একর জমিতে এই দিঘি খনন করা হয়েছে। খননকৃত মাটি এর চারদিকের পাড়ে ফেলায় পাড় সমতল ভূমি থেকে খুব উঁচু হয়। বিশেষ করে দক্ষিন পাড় পাহাড়ের মতো উঁচু। দীঘির দক্ষিন-পশ্চিম পাড়ে এই দরগার ফকির-খাদেমের বসতি গড়ে উঠেছে।

খুলনা-খান-জাহান-আলী-মাজার-শরীফ-৩তিনি মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকেও নজর দেন। কেননা, এসব মসজিদে যাতায়াতের জন্য রাস্তা, ব্রিজ ইত্যাদির প্রয়োজন। তিনি বহু জলাশয়ও নির্মাণ করেছেন।

এসব ছাড়াও আরো কছিু মসজিদ রয়েছে দেখার মত। যেমন: নয়গম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগনির মসজিদ চুনখোলা মসজিদ, সিংরো মসজিদ, এক গম্বুজ মসজিদ, দশগম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি। বাগেরহাট জাদুঘর, অযোদ্ধার মঠ, প্রাচীন জমিদারবাড়ি ইত্যাদিও ঘুরে দেখতে পারেন।

ভ্রমণপিপাসু বিশেষ করে যারা ইসলামী ঐতিহ্য দেখেতে ভালবাসেন তাদের জন্য বাগেরহাট ভ্রমণ করাটা খুবই উপভোগ্য এবং স্মুতিময় হবে। তবে একটি দু:খের বিষয় হল বর্তমান প্রজন্মের কিছু কুলাঙ্গার ব্যক্তি খান জাহান আলী (রহ.) এর আদর্শকে ভুলে গিয়ে লিপ্ত হয়েছে শিরকি কাজে। এক আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করতে আসা রাজ্য জয়ী খান জাহানের আদর্শকে পায়ে ঠেলে এরা তারই কবরকে নিয়ে চালাচ্ছে নানা শিরকি কর্মকাণ্ড।

NO COMMENTS

Leave a Reply